Header Ads

শুভায়ুর রহমানের একটি গল্প "স্বপ্নের বেনোজল"


স্বপ্নের বেনোজল
শুভায়ুর রহমান

সুলতানগঞ্জ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কিমি খানেক।কয়েকটি বাঙালি মেসের ছেলেরা সকাল ন,টা থেকে স্নানের জন্য লাইন দিতে থাকে।চোখ মুছতে মুছতে শালুক প্রেসার কুকারটা চাপিয়ে বাথরুমে ঢোকে।বাথরুম থেকে আশিককে ভাত টা নামিয়ে দিতে বলে।কিছুক্ষণ পরে নাকে মুখে গোঁজা শুরু হয়।আলু সেদ্ধ আর প্রেসার কুকারের পোড়া ভাত অমৃত। খেতে খেতেই আশিক, শালুক আর সুফিয়ানরা আলোচনা করছিল আফরিন কে নিয়ে।

আফরিন ক্লাসমেট। পড়াশুনো র পাশাপাশি আঁকতে পছন্দ করে।দেখতেও তেমনি সুন্দরী ও নাদুসনুদুস। আফরিনের সাথে শালুকের সম্পর্ক সব চেয়ে ভাল।উত্তর বঙ্গের মেয়ে আর দক্ষিণ বঙ্গের ছেলের সাথে সুমধুর সম্পর্ক দেখে অনেকেরই চোখ টাটাই।

সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেয়ারওয়েলের মিটিং এ ওরা অনুপস্থিত। দাদারা চলে যাবেন।সংবর্ধনা দিতে হবে।আলোচনার আগে কে যেন বলল"আফরিন আর শালুক নেই, আলোচনা কি হবে?"
কথা টি তোলা মাত্রই ইমরান তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলল"ওদের কবে পাওয়া যায়?ওরা তো কৃষ্ণাঘাটেই সারা দিন বসে থাকে।ওদের ছাড়াই আলোচনা হবে।"

গ্রামের ছেলে শালুক।বাবা মায়ে নাম দিয়েছিল শালুক।সেই মতো সবাই ডাকে।অভাবী পরিবারের শালুক গ্রাম ছেড়ে অজানা পাটনা শহরে এসেছে।তার সুন্দর কাব্যিক ভাষা ও লেখালেখির দক্ষতা দেখে ক্লাসে সবাই কম বেশি ভালবাসে।একমাত্র ব্যতিক্রম ইমরান। তার চোখের বালি শালুক।আর হবে নাই বা কেন?বড়লোকের ঘরের ছেলে দেখতে বেশ নজর কাড়া,হৃতপুষ্ট ফিগার।এত লেগে থেকেও মাঝ দরিয়ায় প্রেমের তরী ভাসাতে পারেনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পিছনে উত্তর থেকে দক্ষিণে উথালপাতাল গঙ্গা বয়ে চলছে।নৌকা নিয়ে ভেসে যাচ্ছে মাঝিরা।একশো মিটার দূরে কৃষ্ণঘাট।ঘাটে বসে দুজনে কাছাকাছি বসে গল্প করছে।শালুকের কবিতার লাইন শুনতেই আফরিন এই ঘাটে জোর করে শালুককে ডেকে নিয়ে আসে।"আজ ভারী গঙ্গায় স্রোত যেন একটু বেশি।স্রোতের সাথে সেই কবিতা টা আবৃত্তি করো না" জানায় আফরিন।

শালুক বলে "কোন কবিতা? "
-দেখছ?তুমি ভুলে গেছ!পরশু হোয়াটস এপে যেটা লিখে পাঠালে।
-কিন্তু সেটা তো তোমার মোবাইলে আছে পড়ে নাও।
-আমি কেন?পড়ব?তোমার মুখ থেকে শুনব।বলো, তার জন্য তোমাকে আমি মাইনে দিই!বলে হেসে উঠল আফরিন।
কথাটি কর্নগোচরে যাওয়া মাত্র শালুকের গোটা শরীরে যন্ত্রণা উঠল।তীরের মতো ফালাফালা করে দিল শালুককে।অভাবী পরিবারের ছেলে।বাড়ি থেকে যা টাকা দেওয়া হয় পড়ার জন্য তা যথেষ্ট নয়।বাড়ির উপার্জন তেমন নেই।
প্রতিবার যখন বর্ধমান স্টেশন থেকে শালুক হাওড়া-পাটনা দানাপুর এক্সপ্রেস ট্রেন ধরে।তখন থেকেই হা.হুতাশ শুরু হয়ে যায়।আফরিনের মুখের কথা শুনে লজ্জায় রাঙা হয়ে গেল শালুকের চোখ মুখ।
-কি হল?চুপ করে গেলে যে? জিজ্ঞাসা করল আফরিন।
-নাহ!তেমন কিছুনা।

আফরিন বলল 'আরে তোমাকে মজা করে বলছিলাম।
-না, আফরিন তুমি ঠিকই বলেছে।আমার গোটা মাস টানাপোড়েন চলে।তুমি আমাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করো।সেটা তো অস্বীকার করতে পারি না!"কাঁপা গলায় বলল শালুক।
-শোন শালুক।
-হ্যাঁ বলো।
-শালুক মাথা তোল।হেঁট হয়ে আছো কেন?আমার দিকে তাকাও।"
শালুক আফরিনের দিকে তাকাতেই দু,চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল শালুকের।
মজার ছলে হলেও কথা টি বলে অপরাধ করেছে।মনে মনে নিজেকে অপরাধী মনে করে আফরিন।দুজনই যেন চুপ করে গেছে।ততক্ষণে দুজনের মধ্যে অনেক টা জায়গা ফাঁকা হয়ে গেছে।শালুক যেন নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নিয়েছে।
আফরিন অপরাধীর মতো আস্তে আস্তে শালুক কে বলে "তুমি আমায় বিশ্বাস করো?"
-হ্যাঁ।
-তুমি আমাকে ভালোবাসো?
-হ্যাঁ।

তবে কেন?আমার কাছ থেকে গুটিয়ে নিচ্ছ।কাছে এসো।কিছুটা বিরক্তির সুরে শালুক কে নির্দেশ।করে।
শালুক, আফরিনের কাছে আসা মাত্রই শালুককে জড়িয়ে ধরে জানায়"প্লিজ..ভুল বোঝ না।আমায় ক্ষমা করে দাও।"
এত সাহসী পদক্ষেপ এর আগে দেখেনি শালুক।শালুকের বুকে তখন গঙ্গা ফেনিল হয়ে উঠেছে।বুকের পাঁজরে শুধুই প্রেমের জয়োল্লাস। শালুকের শিরা উপশিরায় নায়াগ্রার জলপ্রপাত তার পরও নিজেকে সংবরণ করে শালুক জোর পূর্বক নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে"কি করছ?আফরিন।অন্যরা দেখছে তো?
-মানে কি?ওরাও তো প্রেম করতে এসেছে
ওরাও কম যাচ্ছে না। তুমি এত ভিতু কেন?আচ্ছা চলো এখন ফিরে যায়।মেসে যেতে হবে।"শালুকও ঘাড় নেড়ে সহমত জানায়।

আজ শালুক ক্লাসে আসেনি।তার জ্বরটা বেড়েছে।ডিসপেনসারি থেকে পাওয়া প্যারাসিটামুলই ভরসা শালুকের।আজ ক্লাসে আফরিনের পাশে ইমরান বসেছে।প্রথম ক্লাস শেষ হলে ইমরান আফরিনকে জানায় "আজ একটা রিকুয়েস্ট রাখবি?"
-হ্যাঁ বলে ফেল।
-না এখানে নয়।চল ক্লাস ঘরের পিছনের বারান্দায় চল।গঙ্গা দেখব আর বলব।

ইমরানের সাথে হনহন করে ক্লাস ঘর থেকে বেরিয়ে গেল আফরিন। বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাত বাড়ালে দেবদারু গাছের ডাল ধরা যায়।ইমরান কয়েকটি পাতা ছিঁড়ে জানাল "আফরিন আর একবার ভেবে দেখ।আমি কি তোর যোগ্য নই।আমার গাড়ি, বাড়ি সবই আছে। আমি কি তোকে সুখি করতে পারিনা"?

ইমরানকে আশ্বস্ত করে আফরিন উত্তর দেয়"নিশ্চয় সে ক্ষমতা তোর আছে। কিন্তু আমি শালুককে অনেক ভালবাসি।তার টাকা নেই। কিন্তু তার মন আছে।আর এটাও জানি তার চেয়ে তুই অনেক বেশি সুদর্শন কিন্তু তার মধ্যে আমি অনেক কিছু খুঁজে পেয়েছি।'কথাটি শেষ হতে না হতে আবারও প্রশ্ন ছুড়ে দিল ইমরান" ও তোকে কতটা ভালবাসে?
"আমি তোর উত্তর দিতে বাধ্য নই " বলে আফরিন উত্তেজিত হয়ে বারান্দা থেকে চলে আসল।
কয়েকদিন পরে সানার সাথে মেডিকাল কলেজের সামনে সানার আচমকা দেখা।
-আরে শালুক তুমি?জিজ্ঞাসা করে সানা।

শালুক অধিকাংশ দিন দু,কিমি পায়ে হেঁটেই বিশ্ববিদ্যালয় যায়।পাছে অটোর ভাড়াটা বেঁচে যায়।
সানার কথা শুনে থমকে যায়।শালুক।
-সানা, তুমি।

-হ্যাঁ আমি তোমার জন্যই অপেক্ষা করছি।আসলে তোমার সাথে একটু দরকার আছে।
আশ্চর্য হয়ে শালুক বলল "আমার সাথে?"
-কেন? তোমার সাথে দরকার থাকতে পারে না।?"
-অবশ্যই। বলো কি দরকার?
এখানে নয়।চলো অন্য কোথাও অথবা কৃষ্ণাঘাটে যাই।

শালুক মনে মনে ভাবল ওখানে তো আফরিনের সাথে দেখা করতে হবে।কয়েকদিন ক্লাসে আসিনি।ফলে ফোনে কথা ছাড়া সামনাসামনি দেখা না হওয়ায় মনটাও বিষণ্ণ হয়ে উঠেছে।
-কি হলো চলো?
আর রা কাড়তে পারল না শালুক।
দুজনে কৃষ্ণাঘাটে পৌঁছল। সানা দূর গঙ্গায় তাকিয়ে বলল"আচ্ছা শালুক ওই যে জোয়ার দেখছ সেটা কি থামিয়ে দেওয়া সম্ভব?
-একদমই নয়।ওটা প্রাকৃতিক নিয়ম।"বলল শালুক
-তাহলে আমার মনের জোয়ার কি করে থামাব?বলে শালুকের হাত দুটি ধরল সানা।
-ছিঃ ছিঃ হাত ছেড়ে দাও।বলছে ততই চেপে ধরছে সানা।

হটাত শালুককে বধ করে দিল দূর দৃষ্টি।আফরিন দ্রুত হেঁটে চলে যাচ্ছে। দ্রুত বেগে...। ঝাড়া মেরে সানার কাছ থেকে দৌড়ে যায় শালুক ।ততক্ষনে সিঁড়ি তে আফরিন। সিঁড়ি তে পথ আটকায় শালুক ।তাকে বোঝানোর চেষ্টা করতে থাকে শালুক। দুজনের বাকবিতণ্ডা দুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ক্লাসের অন্যরা সিঁড়ির মুখে চলে এসেছে।
-আমার টাকায় পড়ছ! আমার সাথে বেইমানি করলে স্বার্থপর  বলে শালুকের গালে সপাটে চড়।
লজ্জায়, রাগে, ক্ষোভে ঘৃণায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে গেল শালুক। ঘরে ফিরে আশিক, সুফিয়ানরা দেখল ব্যাগ পত্তর গুটিয়ে শালুক চলে গেছে।

সবার মধ্যে চাপা গুঞ্জন শুরু হল।শালুক তো এই রকম ছেলেই নয়। কারও বিশ্বাস হচ্ছে না।মনমরা হয়ে গেল আফরিন। খাওয়াদাওয়া প্রায় ছেড়েই দিল আফরিন। আফরিনের দু:সময়ে ইমরান সঙ্গ দিতে থাকল।

কয়েক মাস পরে মেসে ইমরানের ঘরে এসেছে আফরিন। ইমরানের জন্ম দিনে আফরিন শুভেচ্ছা জানাতে এসেছে।ইমরানের ঘর থেকে ওরা বন্ধুদের সাথে নিয়ে রেস্তরাঁয় যাবে। তার আগে ঘরে ইমরান আফরিন কে বলল তুমিই আমার কাছে শুভেচ্ছা, ইচ্ছা, ভরসা, তুমিই আমার গিফট। এর চেয়ে আর কি চাইব বলে আফরিনের হাত দুটি ধরল ইমরান।আফরিন বাধা দিল কিন্তু পেরে উঠল না।আফরিনের ঘাড়ে,চিবুকে চুম্বনের পরশ।সমস্ত শ্বাসচাপ বয়ে চলেছে দুজনের মধ্যে।আফরিনের নাভীতে ইমরানের ঠোঁট কিলবিল করছে। ইমরানের মুষ্ঠিবদ্ধ আফরিনের স্তন যুগল। অবিরাম প্রশ্বাসে দুজনে হারিয়ে গেল বিভোর জগতে। একটু পরে ভুল ভাঙল আফরিনের। ইমরানের দিকে আর তাকাতে পারছে না।ছিঃ কি সব হয়ে গেল!?আর এক মুহুর্তে ইমরানের ঘরে থাকতে চায়না।বের হয়ে গেল ইমরানের ঘর থেকে।
কয়েক দিন পরে সানা আফরিনের মেসে গিয়ে  হাঁউমাউ করে কেঁদে ফেলল।
-"ভুল করেছি।আফরিন মারাত্মক ভুল।তুই আমাকে ক্ষমা করবি কি জানি না।তবে এই ভুলের কোন ক্ষমা হয় না আমি জানি।আমি তোর ও শালুকের জীবনটাকে শেষ করে দিয়েছি।"

-কি বলছিস তুই?মানে কি?আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করে আফরিন।

-এটাই সত্যি।ইমরানের প্রলোভনে পড়ে আমি গঙ্গার ঘাটে শালুক কে নিয়ে গিয়েছিলাম।আমি ওকে জোর করেছিলাম।যাতে তুই দেখতে পাস।তুই ঘাটে গিয়েছিলি তা আমি লক্ষ্য করেছিলাম।কিন্তু আমি ইমরানের কথা শুনে।কয়েক দিন আগে  অভীক শালুককে ফোন দিয়েছিল।সে খুবই অসুস্থ ছিল।

সব কথা শুনে থ মেরে গেল আফরিন।টেবিল থেকে মোবাইলটা নিয়ে ফোন দিল শালুককে। ওপার থেকে কান্নায় ভেসে আসল।"শালুক আর নেই।পাটনা থেকেই জ্বর নিয়ে ফিরেছিল।ঘন ঘন জ্বর।ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ায়  পরশু দিন মারা গিয়েছে।

কোন কথা বলতে পারল না।আফরিন।কষ্টের বাঁধ মানল না।অত্যধিক দু:খে,কষ্টে  অভিমানে চোখের জল নিয়ে ঘরের মেঝেয় কান্নায় ভেঙে পড়ল আফরিন।

No comments

Powered by Blogger.