Header Ads

রফিকুল হাসানের একটি গল্প 'নীল স্বপ্ন'


নীল স্বপ্ন
রফিকুল হাসান

আজ নীলের জন্ম দিন। জন্মদিনটা নীল ভালোই টের পায়।কারন ওর জন্ম দিনটায় বাবার মুখভার আর দিদির চোখ জলে ছলছল! নীলকে জন্ম দিতে গিয়ে তার মা মারা যায়।এমন এক কলঙ্ক এর বোঝা নিয়ে জন্ম যার, তার বাঁচার অধিকার কতটুকু, ছোট্ট নীল নিজের মনকে শৈশবেই এসব প্রশ্ন করে।অদ্ভুত সব ভাবনাগুলি মাথার ভিতর লাট্টুর মত ঘুরপাক খেতে থাকে সে সব ভাবনা গুলো পাখনা না মেললেও ছোট্ট নীলের ছোট্ট শৈশবকে উড়িয়ে পুড়িয়ে খাক করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। তবুও শৈশবেরই জয়! যদিও নীলের বাবা লুকমান সেখ মাঝেমধ্যে রাগের বশে বলেই ফেলে "তোর মত অনামুখ ছেলে যার জন্মলগ্ন ই কিনা একটা দুর্ঘটনা!" প্রথম প্রথম  এমন কথা মাতৃহারা নীলের বুকে শেলের মতো বিঁধত এখন সেসব অনেকটাই  গা সওয়া হয়ে গেছে। বাবা বা পৃথিবীর সমস্ত মানুষ জনকে সে তার বয়সি অন্য বালকের চেয়ে দ্রুত গতিতে চিনতে শিখেছে। এমনি ভাবেই তার সুন্দর শৈশবে বড়মি'র থাবা! তবু শৈশব খেলা করে সাতগুটি, গোল্লাছুট,ডাংগুলি আর গুলতির সঙ্গে চুটিয়ে!

        নীলের বয়স এখন আট। সে এখন ক্লাস টু থেকে থ্রী। ক্লাসে মাতৃহারা নীল সহপাঠিদের নয়নের মনি। তার সহপাঠিদের অন্যতম নয়ন হল নীলের বেস্ট ফ্রিয়েন্ড। সারাক্ষণের সঙ্গি। তার সঙ্গে স্কুলে যাওয়া, খেলাধূলা এমনকি সকালের প্রাতঃকৃত্য ও একসঙ্গে করে কখন ও সখনো! ছুটির দিন গুলি নীল- নয়নে মিলেমিশে শৈশব ভুবনে পোড়াগুন্দির মাঠ বা পাথুলির বাঁকে পাখি ধরার নেশায় কাটায়। কখনো বা ঘুড়ি ওড়ানো,  মাছ ধরার নেশা পেয়ে বসে তাদের। রঙিন শৈশবে শীতের বিকেলে তারা মাঠে মাঠে হূড়ার উৎসবেও মাতে। গেল বার পূজার ছুটিতে নীলের একমাত্র মামা হারু নীলকে বরিদতলার মেলা নিয়ে গিয়েছিল সেখানে নীলকে একটা খুব সুন্দর বাঁশের বাঁশি কিনে দিয়েছিল কিন্তু নীল সেটাকে বাজাতে পারত না তাই মুছে মুছে রেখে দিত,আর পারলে পাশের বাড়ির নূর আলমকে দিয়ে বাজিয়ে নিত। নূর যখন ঠোটে সুর তুলত তখন নীল বিভোর হয়ে শুনত! সাত রন্ধ্র এর সেই বাঁশি নীলকে মোহিত করত। এসবের মধ্য দিয়ে ছোট্ট কিশোর টির দিন কাটতে থাকে। মন টা তার সদা সর্বদা মাঠে ঘাটে, হয়ত মা যে কি তা না জানার জন্যই সে কেমন উদাস উদাস! যদিও মাতৃহারা নীলের বাবা বর্তমান। তবুও তার নেই নেই মনে হয়! তার একটাই কারন বাবা সদাব্যাস্ত ব্যাবসা নিয়ে। বাকি সময় বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে তাস পাসায় মশগুল বাবা। সংসারে সাকুল্যে তারা তিন ভাই বোন।  এক মমতাময়ী দিদি ফেন্সি ও এক রগচটা দাদা কারুন। দিদি বয়সে ষোড়ষী হলেও হাবে ভাবে একটু বয়স্কের ছোঁয়া।  হবে নাই বা কেন    বাড়ির গৃহীনির সমস্ত দায়ইত তারই কাঁধে। বোধহয় সেই জন্যই এই পরিণতি! পড়াশুনা ও বেশিদূর এগোয়নি সেই একই কারনে। তিন তিন বার ক্লাস এইটে ফেল করে সেখানেই ইতি তার স্টুডেন্ট লাইফের! তাতে ওরই বা কি দোষ।  আর ওদিকে দাদা কারুন বি.এ. সেকেন্ড ইয়ারে পড়তে পড়তে ছেড়ে দিয়েছে। সম্ভবত ওর রগচটা স্বভাবের জন্যই এই খামখেয়ালীপনা! এখন বয়স নয় নয় করে বাইশের কোঠায়। গালে হাল্কা দাড়ি। হাবভাবে বিজ্ঞ বিজ্ঞ ভাব। এই নিস্কর্মা কারুনের প্রধান কাজ হচ্ছে ক্লাবে ক্যারাম পেটানো নয়ত পাড়া ক্রিকেট। বাড়িতে এক মুহূর্ত মন টেকে না। যেন তার বাইরে ঘোড়া বাঁধা আছে।বিরাট তার কর্ম জগৎ সে না গেলে সব লুটপাট হয়ে যাবে। তাই পেটপুজা সারা হলেই হল, দে ছুট। আর যদি কোন দিন বা একটু বেশি সময় বাড়িতে থাকলো সেদিন শুধু শাসন আর তর্জন গর্জন। তার জ্বালায় অতিষ্ঠ ছোট ভাইবোন।  তারা চাই সে বাড়িতে না থাকুক। তবে কিছু কিছু কিছু কাজ যেমন রেশন আনা বা দোকানপাট বা হাটবাজার ইচ্ছে হলে মাঝে সাঝে বাবার কাছে টাকা নিয়ে যায় বইকি। আর তা না হলে বোন ফেন্সি ত রয়েইছে। শৈশবে মাতৃহারা এই মেয়েটি সংসারে জুতো সেলাই থেকে চন্ডি পাঠ সমস্তটাই সে করে। বাবা ত ইনকাম করেই খালাস!বাবার ব্যস্ততা ব্যবসা নিয়ে।বাবার কাপড়ের ব্যাবসা ভালো চলেনা তাই তিনি আরও একটা ব্যাবসা করেন সেটি হল দোকানে দোকানে মুদির মাল সাপ্লায়। তাতে একটি মাসিক নিরাপত্তা আছে। তাই বাবা প্রায়শই নরম সুরে বলেন 'বাবা কারুন তুমি কাজটি তুমি শিখে নাও। কাজে লাগবে। কে শোনে কার কথা! এক কান দিয়ে ঢোকেত অন্য কান দিয়ে বেরিয়ে যায়। সংসারে কারুনের দায় দায়িত্ব বলতে ছোট ভাই বোনেদের ভুল ত্রুটি ধরা আর তাদের কারনে অকারনে শাসন করা। এমন এক খুঁতখুঁতে স্বভাব তার।আর এই স্বভাব বশে বোন ফেন্সির সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি লেগেই আছে। যেন এটাই কারুনের নিত্য কর্ম। পাশের বাড়ির কুরবান মিয়াঁ ত একদিন বলেই বসলেন "মা লক্ষী রকেয়া মারা যাওয়ার পর বাড়িতে যেন ঝগড়ার জীন ঢুকেছে। জয়নাল পীরের তাবিজ এনে বাড়ি বন্ধ করা আবশ্যিক।  না হলে কোন দিন একটা বিপদ হল বলি।" পাড়ার মুরব্বিদের বিভিন্ন মন্তব্য। তার ফাঁকে মহব্বত আলি শাঁসিয়ে যায় বলে যায় 'রাত দিন তুদের ঝগড়া পাড়ার লোকেদের থিতু হতে দেবে না।' এর পরে কিন্তু ছাড়ব না,  কোন শালারে নুইসেন্সের কেস যদি না দি'। বলতে বলতে চলে যায়। প্রতিবেশিদের কটুক্তিতে ফেন্সি লজ্জা পায় ঠিকই কিন্তু নির্লজ্জ কারুন ঠিক উল্টোটি। সে রেগে গিয়ে পাশের বাড়ির লোকেদের উদ্দেশ্যে মন্তব্য ছুড়ে দিয়ে বলে '"তোদের বাপের কি রে ঝগড়া ত করছি আমরা নিজেদের মধ্যে।" বলতে বলতে প্রায়শই ঝগড়া মোড় নিতে গিয়ে মিটে যায়।
       
       সেদিন আর ও একটা ঘটনা ঘটল। দিনটা ছিল ফাল্গুন মাসের কোন এক রোববার। বেলা দশটা। কারুন যাবে পাশের গ্রাম। গ্রামের নাম মহেশপুর। সেখানে প্রতি বছরের ন্যায় এবারেও ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। কারুন খেলবে নিজের ক্লাব 'সবুজ সংঘ' এর হয়ে। দারুন তাড়া।  এগারোটায় খেলা শুরু। তাই সে ফেন্সিকে বলল "ভাত দে তাড়াতাড়ি দেরি হয়ে গেলো। তোদের কোন কাজেই হাত চালাকি নেই, সব কিছুতেই চালাকি আর ঢিমে তাল! কাল থেকে বলেছি না তাড়াতাড়ি করে আমার ভাত চাই, রোববার আমাদের ক্লাবের খেলা আছে। তো ঠিক উল্টোটাই করছিস।" কথা শেষ হিতে না হতেই ফেন্সি নরম সুরে বলে  " এখনো একটুকু বাকি। মিনিট দশেক বসো, তরকারি ফুটলেই হয়ে যাবে।" বেচারির সেদিন শরীর ভালো ছিলো না। সকাল থেকে জ্বর জ্বার ভাব ছিল। তাই বিছানা ছেড়ে উঠতে অনেক দেরি হয়ে ওঠে। তাছাড়া ঘুম থেকে উঠেইত একটা কাজ নয়! হাজার একটা কাজ। যেমন প্রথমেই সকলকে চা করে দেওয়া,ঝাঁটা দিয়ে ঘর দোর পরিস্কার করা,তার পরে রান্না বান্না। মা মরা মেয়েটির মাঝেমধ্যে কান্না পেয়ে যায়,  চেপে যায় সে। এত সব কাজের কথা কারুন কোনদিনই ভাবে না। আজও তাই, ভাত চাই কিন্তু ভাত হয়নি শুনেই বাকবিতণ্ডা শুরু। তার উল্টোপালটা কথার ফাঁকে ফেন্সি বলে বসে-" বাবুর দশটায় ভাত চায়, যেন অফিসার অফিস যাবেন! ভীষণ তাড়া, কাজের বেলায় কুড়ে আর ভোজনে দেড়ে। বাবা খেটে খুটে হাড়ে চামড়ায় আর ছেলের  নাবাবীপনা! ফুটুনি  দেখে বাঁচিনা! ক্রিকেট খেলবেন সৌরভ হবেন,গো!  দেখে যাও সৌরভ গাঙ্গুলি দেশের গৌরব বৃদ্ধি করতে যাচ্ছেন!" এই কঠোর বাস্তব কথা গুলো রগচটা কারুনের রাগের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। সে মুখে কথা না বলে ছোট বোনের দিকে তেড়ে যায়। কিন্তু সেদিন হাতাহাতি হয়নি একমাত্র পাশের বাড়ির সেলিনা বিবির জন্যই। সেই একমাত্র আগ বাড়িয়ে ঝগড়ার মধ্যে ঢুকে দু জনকে দুদিক করে দেয়।বলতে গেলে এটি তার প্রাত্যহিক কাজের অঙ্গ স্বরূপ। প্রতিবেশীরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা লুটলেও সেলিনা বিবি পারেনা তারই বাল্য সখি রকিয়ায় ছেলেমেয়েদের ঝগড়া দেখতে। তায় সে প্রায়শই শাসনের সুরে বলে-"তোদের কি কোন লজ্জা শরম নেই? তোরা কি নির্লজ্জ বেহায়া জাতের পয়দা! আর কদিন, কদিন চালাবি এমনি করে। বড় বড় ধেড়ে ধেড়ে ছেলে মেয়ে, বিয়ে দিলে এত দিন জন্ম দিতিস! তোরা যদি এমনি করিস তবে দুধের মাসুম নীলু আমার যায় কোথায়! তোদের ব্যাপার তোরা বুঝবি সবই তোদের ভূত-ভবিষৎ" বলতে বলতে সেলিনা সেলিনা বিবি সেদিনকার মত গুরু দায়িত্ব পালন করে কেটে পড়ে। কারুন ও বেরিয়ে যায় খেলার পোশাকে।

      এমনই এক মানসিক সংকটময় পরিবারে দাদা দিদির ছোট্ট আট বছরের ভাই নীল নিজের ভূবনে ঘোরে। বাড়িতে তার লোনলিনেস বুঝবে এমন লোকজন নেই বললেই চলে। তবু দিদি মাঝে সাঝে মন রাঙ্গানো গল্পগুজবে মাতায়। সে আর ক'দিন! যেদিন মন ভালো থাকে বা কারুনের সাথে ঝগড়াঝাঁটি বন্ধ থাকে সেদিনই হয়ত! বাকি সব দিন ঝগড়া শুনে শুনে ছোট্ট কিশোর মন অতিষ্ঠ! ছুটির দিন আরো বেশি একা একা লাগে। পাশের বাড়ির নয়ন সে ত বিকেল বেলা ছাড়া ছাড় পায়না, অতএব তাকে পেতেও বেগ পেতে হয় নীলকে। এমনই এক নিসঙ্গ কিশোর  নীল। তার নিসঙ্গতা মাঝেমধ্যে তার মাকে কল্পনায় আনে। সঙ্গতা দেয়। ভাবতে ভাবতে সে অনেক অনেক দূর চলে যায়। যেখানে মা তাকে আদর ভরা গলায় ডাকছে "বাবা নীল কাছে আয় বাপধন তোকে দেখি"!  গলা জড়িয়ে ধরে কতনা গল্প বলছে। রূপকথার রাজা রানী আর পঙ্খীরাজ ঘোড়া, সাত সমুদ্র তেরো নদী সমৃদ্ধ। সেসব গল্পের কথা ভাবতে ভাবতে প্রায়শয়ই সে ঘুমিয়ে নিজেই রাজপুত্র হয়ে ওঠে। এসব তার নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা।

      দাদা কারুন ত রগচটা আর দিদি ও বাবা সব সময় যে যার কাজে সদা ব্যাস্ত। তাহলে কে হবে তার সেসব আবেগ ঘন মূহূর্তের সঙ্গি? এমনি করে কাটতে থাকে একটি নিসঙ্গ কৈশোর।  

     সেদিন ফাল্গুন মাস। বারে শুক্রবার। ফাল্গুন মাসের সতেরো তারিখ। প্রতি বছরের ন্যায় এবছরেও জমকালো মেলা বসেছে। দারুণ আকর্ষণ। গ্রাম থেকে গ্রামান্তর লোকে লোকারন্য।  রাতদিন সাতদিন ব্যাপি এই মেলা চলে। আজ তার ষষ্ঠ দিন। তাই রাস্তায় মধ্যরাতেও পদ ধ্বনি ধ্বনিত হয়। শীত শেষে ধূলি উড়িয়ে কাঁধে ছেলেপুলে নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় দলে দলে লোক যায়। ভেঁপু, বেলুন, বাঁশি, ঝুনঝুনির আওয়াজে রাতদিন নীলের ঘুম হয় না। কিন্তু হায়, কে তাকে মেলা নিয়ে যাবে! কে কিনে দেবে ভেঁপু, বেলুন বাঁশি আর হরেকরকম খেলনা। কেউ নেই তার মেলা নিয়ে যাওয়ার! দাদা কারুনের ছোট ভাইকে নিয়ে মেলা যাওয়াত দুরস্থান, মেলা যাওয়ার নাম শুনলেই সে নীলকে রেগে তেড়েফুঁড়ে মারতে যায়। বলে ছিঃ  গ্রামের মেলা মানেইত যতসব রঙিন জিলিপি, কাঠের নকল বাঁশি, ধূলোবালিভর্তি বাতাস যাচ্ছেতাই! একদম যাবিনা। ওখানে যায় ছোট লোকদের ছেলেরা। ওদিকে পা বাড়াবি ত  ঠ্যাঙ খোঁড়া করে দেব। একদম ওদিকে কদম বাড়াবিনা। আমি বৈশাখ মাসে বরিদ তলার মেলা যাবো ওখান থেকে তোর জন্য মাউথ অরগ্যান এনে দেবো। দেখবি কেমন সুন্দর বাঁশি!  বাজাবি আর অবাক হয়ে যাবি!

এখন যা দেখিনি ভালো ছেলের হাতমুখ ধুয়ে চুপচাপ  পড়তে বস। আমি ক্লাব থেকে ঘুরে না আসা পর্যন্ত চাটাই ছেড়ে উঠবিনা কিন্তু।

যদি দেখি উঠেছিস তো  পেঁদিয়ে লাল করে দেবো।" বলতে বলতে গায়ে জামা গলিয়ে বাবু বেরিয়ে গেলেন ক্লাবের উদ্দেশে। নীল তখন মুক্ত নীল আকাশের ন্যায় মুক্ত। তখন পড়ন্ত বিকেল। কেবল সূর্যাস্তের বাকি। আকাশ বাতাসে ফাল্গুনি হাওয়া। আট বছরের নীলের ফাল্গুনি  মন খুশিতে ডগমগ। মাতৃহারা ভাইটির ওপর দিদির তেমন শর্ত আরোপ অভ্যেস ছিল না কোনদিন। আজো ও তার ব্যাতিক্রম হল না।

এখন নিয়ম মাফিক বাবা বাড়ি নেই। রগচটা কারুন ক্লাবে। এমত অবস্থায় কে সামলায় নীলকে। তদুপরি গ্রামের মেলা বলে কথা। আজ আবার মেলা শেষের আগের দিন, সর্বোচ্চ দিন, সব মিলিয়ে বিরাট উত্তেজনায় নীল। মেলা মানে একাকিত্তহীন চিত্ত, যেথায় হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা! মেলা মানে পুতুল নাচের ডাক। " আরে রে রে আসুন আসুন আমাদের শো চালু বা শুরু হতে চলেছে, আজকের পালা ক্ষুদিরামের ফাঁসি"! যদিও রোজই হচ্ছে ক্ষুদিরামের ফাঁসি! নীলকে টান মারল সেই ডাক। পরক্ষনেই মাইকে গান "ডাক দিয়েছেন দয়াল আমার রে, রইবো না আর বেশি দিন তোদের মাঝারে" এই সব অদ্ভুত ডাক নীলকে টান মারল। সেই এক ডাকে একটানে নীল ততক্ষনে মেলাপ্রাঙ্গনে হাজির।মামার দেওয়া গোলাপি জামার বুক পকেটে দশ টাকার নোট আর কিছু খুচরো নিয়ে সে সারা মেলায় ঘুরতে লাগলো। আসলে গ্রামের মেলাত, তাই সবাই সবাইকে চেনে তার ফলে হারিয়ে যাওয়ার ভয় থাকে না।
    
     বুকভর্তি  উত্তেজনা আর খুশিতে ডগমগ হয়ে নীল ছুটে যায় মেলার এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত। আজ তার বাধাহীন চিত্ত, তাই কোথাও হারিয়ে যেতে নেই মানা গোছের মনভাব। ঘুরতে ঘুরতে সে দাঁড়ায় ইলেকট্রিক নাগরদোলার ঠিক সামনে। এটা তার কাছে ছোট থেকেই খুব অবাক করা যন্ত্র। অনেকদিন থেকেই তার সখ ইলেকট্রিক নাগরদোলায় চড়ার। এই নাগরদোলা আজ ও তার বুকে আগের মত টান মারল। কিন্তু সাহস হয়নি চড়ার। তায় সে অনতিদূরে চেপে বসল ঘোড়ার পিঠে। দশ পয়সায় বিশ পাক ঘুরলো।  চোখে মুখে দারুন খুশি যেন দশ পয়সায় সে বিশবার বিশ্ব প্রদক্ষিণ করল আজ। দোদুল্যমান নীল নাগরদোলার দোলা  আজ প্রথম পেলো। ভাবতে অবাক লাগছে। মনে মনে দারুন একটা খুশির হলকা বয়ে গেলো।  হৃদয়জুড়ে একটা আনন্দের ধারা। ঠিক তখুনিই সে হাসিমুখে  ছুটে গেলো গঙ্গাযমুনার দিকে। গঙ্গা যমুনা মানে একটা মেয়ের দুটি দেহ, দুটি নামে ডাকা হচ্ছে। সেই বিধাতাসৃষ্ট বিকৃত শরীর দেখিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি চলছে। আর উচ্চস্বরে বলছে " দেখে যান বাবুরা, দেখে যান ভগবানের বিস্ময়কর সৃষ্টির নিদর্শন! নীল ও সেখানে সবার মত ছুটে গেলো। গিয়েই সে অবাক। পায়ের দিক এক অথচ দেহ থেকে আলাদা। কি অদ্ভুত।  মানুষ না ভূত ভেবেই পাচ্ছে না নীল।  নীল অবাক নয়নে দেখতে দেখতে মনে মনে বলছে "হে আল্লা এ তুমি কি বানিয়েছ।" সব্বাই পয়সা ছুড়ছে দেখে নীল ও পকেট থেকে একটা আধুলি ছুড়ে দিয়েই তার এক মুহূর্ত সেখানে মন টিকলো না। সে হাঁটা দিলো প্রজাপতির দিকে। প্রজাপতি মানে এখানে একটি বাচ্চা মেয়েকে প্রজাপতির মত সাজিয়ে দাঁড় করানো হয়েছে। আর তাকেই জিজ্ঞেস করা হচ্ছে  "তোমার নাম কি? তুমি কোথায় থাকো?  তুমি কি খাও?" সেই প্রজাপতি তখন উত্তর দিচ্ছে সাজানো গোছানো।  সব শেখানো বুলি বাচ্চা দিয়ে বলিয়ে সেখানেও লোকের মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে ধর্মের ঝান্ডা দিয়ে!

        আজ সারা সন্ধ্যেবেলা নীল ইচ্ছেমতন ঘুরছে সারা মেলা। সে যেন আকাশে ডানা মেলা কোন পাখি। তাই তার মেলায় হারিয়ে যেতে নেই মানা। সে আজ মেলায় একটা তিন টাকার নামাজী টুপি পাঁচ টাকায় কিনে টুপিও পড়েছে। একটি ভেঁপু,  বেলুন বাঁশি ও একটা কাঠের বাস ও কনেছে। দারুন মেজাজে যা ইচ্ছে ইচ্ছেমতন খেয়েছেও।
  
       অনেক হেঁটে এখন সে খুব ক্লান্ত বোধ করছে। তার পা যেন চলেনা। তবুও সে হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে সে ফিরে এসেছে একদম মেলার কেন্দ্রে। কেন্দ্রটি হল দুলাল বিবির আস্তানা। যে আস্তানাটিকে কেন্দ্র করে কয়েক যুগ ধরে চলছে এমনই এক ফাল্গুন মাসের মেলা। এই পীর বিবি কে ঘিরে ঘরে ঘরে গল্প আছে উনার কাছে যা চাওয়া হত সঠিক ভাবে মানত করলে পাওয়া যেত। আর পাঁচ পীরের ন্যায় তাঁর দরগা ও বেশ বড়সড় ও সুসজ্জিত।  আর সুন্দর সুসজ্জিত মাজার শরিফ টিকে ঘিরে মেলাও চলে রমরমিয়ে।  ভক্তেরা ছুটে আসে দলে দলে, পাকুড় গাছের কাছে সুসজ্জিত আস্তানায়। যেখানে একটি সান বাঁধানো কবর, জরির কারুকার্য করা চাদরে চাদরে বেশ খানিকটা উঁচু। বছরে বছরে চাদরও পাল্টানো হয়। প্রতি বছর চল্লিশ পঞ্চাশ খান নতুন চাদর চাপে। রিক্সা পার্টি,  মজদুর সংঘ, ব্যাবসা সমিতি কত দল চাদর চাপায় এই দরগায়! কখনো কখনো কেউ কেউ আবার ব্যাক্তিগত ভাবেও চাদর চাপায় এই দরগায়। যার যেমন মানত সে তেমনই মানে। একটু ও নড়চড় করে না। কেউ যদি মুখ ফস্কে মানত করে বসে তাও সে নড়চড় করে না। প্রচলিত আছে মা দুলালীর দরগায় কেউ কোনদিন  খালি হাতে ফেরেনি,  সবাই কামিয়াব হয়েছে। তাই একটা বিশ্বাস আদ্যিকাল থেকে মানুষের মনে দানা বেঁধে উঠেছে। আর সেই বিশ্বাস কে ঘিরেই এই মেলা প্রাঙ্গন। যেটি এখন মুর্শিদাবাদের এক অজ পাঁড়া গাঁ খাঁড়েরার একটি বিরাট ঐতিহ্য পুর্ন ঐতিহাসিক মেলা। যে মেলায় রাতদিন সাতদিন ব্যাপি চলে লালনগীতি,  ফকিরি গান, বাউল,  লোকগীতি আর চলে ফকিরের নৃত্য,গাঁজার টানের কলা কৌশল।সব কিছুই  চলতে থাকে, চলতে থাকে, নিয়ম মাফিক ঝড়ে বক পড়ে ফকিরের কেরামতি ও বাড়ে!

        সেদিন সন্ধ্যে ঝিরঝিরে ফাল্গুনী হাওয়া।বাতাস শিউলির সৌরভে ম' ম' করছে।  তখন ক'টা মেরেকেটে সবে সন্ধ্যা সাতটা।  ক্লান্ত নীল জড়িয়ে আসা চোখে পীর ফকীর, খাদিমদের অলক্ষে ঢুকে পড়ে দরগার এক কোনে। যেখানে আম আদমি কারুর ঢোকা বারন। একটাই কারন মায়ের গর্ভগৃহের পবিত্রতা বজায় রাখা। সেখানে প্রবেশ করে ক্লান্ত নীল বসে বসে ভাবতে থাকে তার মা'র কথা। আর মনে মনে অস্ফুটভাবে বলতে থাকে "মা মাগো মা দুলালী তুমি আমার মা'কে ফিরিয়ে দাও মা! তুমাকে আমি জোড়া মোরগ দুবোই,  দুবো,   কুরানির কিরি বলসি"  বলতে বলতে তার মিষ্টি মুখের জড়িয়ে আসা দুই চোখে ভেসে ওঠে বাবার শোওয়ার ঘরে টাঙ্গানো মা'র সেই হাসিমাখা মুখের ছবিটি। সেটা যেন নেমে আসছে সাত আসমান দূর থেকে। পরনে তার তাঁতের নীলপেড়ে শাড়ি,  কপালে সোনালী মুকুট।  বড় বড় সিঁড়িতে পা ফেলছেন তিনি। আর তার এক একটা পদক্ষেপ নীলের বুকে তৈরি করছে এক একটা ঢেউ!  নীলের চোখে মা'র শাড়ির নীল পাড় নীল আকাশপট এ ছবি আঁকে। শাড়ির আঁচল রামধনু তৈরি করে চোখজুড়ে। তার মা'র চোখ যেন তারার মত মিটমিট করছে। মা বড় বড় পা ফেলে ফুলে ফুলে নেমে আসছেন  মআআ দুলালীর মেলায়!  মায়ের মুখ যেন পূর্ণিমার চাঁদ। আর সেই চাঁদ মুখে মা'র ঘন কালো চুল যেন  শ্রাবনের চাপা কালো মেঘ। যা ঢেউ খেলে খেলে উড়তে থাকে আকাশের কিনারায়। মা হাসছেন, নীল দেখছে মায়ের হাসি মুখের শূভ্র দন্তরাজি যা দেখে নীলের মনে আকাশের পেঁজা তুলো মনে হচ্ছে। মায়ের মুখেও চাঁদের মত তিল ঐ ত স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে নীল। দুহাত বাড়িয়ে মা তাকে প্রকৃতির মতই ডাকছে " আয় খোকা খেলবি আয় আমার সাথে খেলবি। তোর জন্য কত খেলনাপাতি, কত শত গল্প সাজিয়েছি। পিদিম জ্বলা নিশুতি রাতে তোকে রূপকথার গল্প শোনাব। ফেন্সিকে যেমন কারুন আরলর ফেন্সিকে যেমন শুনিয়েছি। তুইত আমার শীত শীত রাতজুড়ে উষ্ণ আলো।  চোখের মনি। তোর জন্য একা একা এই আকাশে মনটা আনচান করে! আমি যে আর কেউ নয়, আমি যে তোর মা! একান্ত আপন।তুই আমার নাড়ী ছেঁড়া ধন। এসব শুনতে শুনতে নীল ভেসে যায় নীল আকাশে।  মা'র হাত ধরে সে মঙ্গল গ্রহে চলে যায়, কখনো চলে যায় চাঁদের মাটিতে। সেখানে সে স্পষ্ট দেখে নেয় চাঁদের বুড়ি ও তার গাই বাছুর। দারুণ খুশি শিশুমন যেন আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপের অধিকারী।  এই মুহূর্তে সে যা চাইছে তাই হুজুরে হাজির। এক সময় সে নিজেই হাজির হয় সাত আসমানের শেষ ধাপে যেখানে পরীরা খেলা করে ফুলের পোশাকে। যাদের পোশাকে সবাই শিশু, এমনই সেই ভালোবাসাময় আসমানি জায়গা! তখন ঘন্টার পর ঘন্টা নীল আসমানজুড়ে চলছে নীলের জয় জয়াকার! যেমনটি চলে বাস্তবের শিশুমনে!

          এমনই এক সুখকর স্বপ্নময়  মুহূর্তে হঠাৎ কানে টান। তখনই রগচটা দাদা কারুন কান ধরে হিড় হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে গেলো তাকে। আর বলতে লাগল "বাঁদর পাজি হতচ্ছাড়া তোমার জন্য কাল রাত থেকে সারা বাড়ি উপোস!  হারামজাদা তুমি কি কানে কালা শুনতে পাওনা? মাইকে সারা রাত ধরে চিৎকাত করে আমার গলা ফেটে গেলো!  আর তুই কিনা এখানে মজা মারছিস! হচ্ছে সব হচ্ছে বাড়ি গিয়ে দেখাচ্ছি মজা। আমি বাড়ি ছিলাম না অমনি সুযোগ বুঝে দে ডুব, হচ্ছে! মা নেইত কি  হয়েছে। তায় বলে এত আদর! ফেন্সি আর বাবার আদরে যেন একটা  আস্ত বাঁদর তৈরি হয়েছে। পড়াশোনা ত শিকেয় তুলেছে। তার উপরে ভয় ডর ও নেই!" বলতে বলতে নীলকে কান ধরে টানতে টানতে বাড়ি নিয়ে গেলো।  নীলের তখন কান লাল। চোখে জল। মুখে চিৎকার ধ্বনি -"আমার খেলনা গুলো এনে দে বলছি, এক্ষুনি এনে দে !" খেলনা হারিয়ে নিষ্কাম,  নিষ্পাপ,  কলঙ্কমুক্ত, যৌনতাহীন, অপার্থিব,  অহিংস শৈশবে  নীলের আর্ত চিৎকার আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হয়-" আমার মা,  আমার মা, মাগো আমার.... "!!!

No comments

Powered by Blogger.