Header Ads

শিবশঙ্কর দাসের একটি অণুগল্প 'ভালোবাসা'


ভালোবাসা
 শিবশঙ্কর দাস

প্লাটফর্মে যখন পা রাখল জয়া তখন ঘড়িতে রাত দশটা। জয়ন্তকে একটা হোয়টসঅ্যাপ মেসেজ করল। ‘এই নামলাম।’
   
জয়ন্ত উত্তর দিল, ‘ওকে।’
   
প্লাটফর্মের বাইরে এসে দেখে একটাও রিকশ বা টোটো নেই। আবার লিখল, ‘আমাকে একটু নিয়ে যাও।’
   
জয়ার স্কুলে আজ একটা মিটিং ছিল। তাই জয়ার স্কুল থেকে বেরোতে দেরি হয়। তার ওপর ট্রেনে গন্ডগোল। জয়ন্ত চিন্তা করছিল। সারা রাস্তা মেসেজ চালাচালি করতে করতে এসেছে। হঠাৎ জয়ন্ত অফলাইন হয়ে গেল। লাস্ট মেসেজ আর দেখা হয়নি।
   
এই মফসসল শহরের স্টেশানে রাত দশটা খুব একটা রাত নয়। হরদম লোক থাকে। প্যাডল ভ্যান, মোটর ভ্যান বা টোটো থাকেই ভেবে জয়ন্ত আর চিন্তা বারায়নি। ফোনটা রেখে বাইরে অপেক্ষা করছিল।
   
এই রাতে যে দুএকজন নেমেছিল তারা এক এক করে হেঁটেই রওয়ানা করেছে। তাই দেখে জয়াও হাঁটা দিল। নিশ্চই জয়ন্ত মেসেজ দেখে এগিয়ে আসবে। ততক্ষণে একটু এগিয়ে যেতে পারবে। স্টেশান থেকে জয়াদের বাড়ি বেশি দূরে না হলেও পথে একটা মাঠ পরে। জায়গাটা বেশ নির্জন। ঝোর জঙ্গলও আছে। একটুখানি আসতেই সামনের লোকগুলো পথ বদলে অদৃশ্য হয়ে গেল। এবার জয়া একা। বুকের ভিতরটা তিরতির করে কাঁপছে। জয়ন্ত এখনও আসছে না কেন? আবার একটা মেসেজ করতে যাবে এমন সময় রাস্তার পাশ থেকে একটা ছায়ামূর্তি পথ আটকাল। ‘ম্যাডাম, রাতটা কী মিষ্টি তাই না? আবার জায়গাটাও নিরিবিলি। চলুন না একটু গল্প করি? দাদা তো বাকি রাতে আছেই।’
   
‘চুপ কর অসভ্য জানোয়ার!’ জয়া গর্জে ওঠে। ‘এক্ষণি তোর মজা দেখাচ্ছি, দাঁড়া।’ বলেই মোবাইল ওপেন করে জয়ন্তকে ফোন করতে গেল। ছেলেটা এসে খপ করে মোবাইলটা জয়ার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে মাঠের দিকে ছুট লাগাল। জয়াও ‘এই মোবাইল দে। মোবাইল দে।’ করতে করতে ছেলেটার পিছনে ছুট লাগাল। একটা ঝোপের আড়ালে আসতেই আরও গোটা চারেক ছায়মূর্তি জয়াকে ঘিরে ধরল। একটা ছায়ামূর্তি এগিয়ে এসে জয়াকে জাপটে ধরল। জয়া আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল। ‘জয়ন্ত বাঁচাও!’
   
ছেলেটা বলল, ‘আমরাই বাঁচাব তোমাকে খুকি। বেশি ছটফট করো না একটু পরেই ছেড়ে দেব। শুধু একটু …’ বাকি কজন শ্বাপদের মত দাঁত বেড় করে খেঁকিয়ে উঠল। জয়া ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে আর্তনাদ করে উঠল। বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে শব্দটা শূন্যে মিলিয়ে গেল। হঠাৎ কে যেন জয়াকে জড়িয়ে ধরা ছেলেটার চোয়লে এক ঘুষি চালাল। ছেলেটা ছিটকে গেল। মোবাইলটা জয়ার হাতে দিয়ে ছেলেটা বলল, ‘তুমি শিগ্গির পালাও। আমি জানোয়ারগুলোকে আটকাচ্ছি।’
   
পরের দিন জয়া আর স্কুলে যেতে পারেনি। জয়া কাল সারারাত ঘুমোতে পারেনি। বিছানায় ছটফট করেছে। সারাদিনেও ট্রমাটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সন্ধেবেলা বসে টিভিতে খবর দেখছিল। হঠাৎ নীচের চলমান ক্যাপশনের দিকে চোখ পড়তেই জয়া চমকে উঠল। অজ্ঞাত পরিচয় দুষ্কৃতির হাতে গতকাল রাতে বিভাস বিশ্বাস নামে এক যুবক খুন। জয়া নিশ্চিত যে সেই ছেলেটাই ছিল বিভাস। গলার স্বর যে জয়ার ভীষণ পরিচিত। সে জন্যই জয়ন্তকে কালকের ঘটনাটা বলতে পারেনি। বিভাস জয়ার ক্লাসমেট ছিল। এক পাড়াতেই থাকত। পাগলের মত ভালোবাসত জয়াকে। উচ্চমাধ্যমিকের পর সব ছেড়েছুড়ে বাউন্ডুলে হয়ে যায়। একদিন বলেছিল, ‘দেখিস আমি তোকে আমার প্রাণ দিয়ে রক্ষা করব।’ জয়া পাত্তা দেয়নি।
   জয়া ডুকরে উঠল। জয়ন্তকে কালকের সব ঘটনা বলে বলল,‘ আমাকে একটু নিয়ে যেতে পারবে বিভাসদের বাড়ি। একটু প্রণাম করে আসতাম।’
   জয়ন্ত বলল, ‘চলো।’

No comments

Powered by Blogger.